Tuesday , July 23 2019
Breaking News
Home / উপন্যাস / মায়া একটি ভালোবাসার গল্প।

মায়া একটি ভালোবাসার গল্প।

মায়া

মেহমুদ হোটেলের বারান্দা দিয়ে ঢাকা শহর দেখছে।হাতে ধোঁয়া উঠা কফির মগ।দুপুরের রোদ তার গায়ে লাগছে।বিরক্তিতে তার কপাল কু্চকে আছে।শাওয়ার নিতে পারলে ভালো লাগতো।এত পরিচিতির ভিড়ে আজ সে অপিরিচিত।।
আজ সকালবেলা সে আমেরিকা থেকে ঢাকায় এসে পৌছায়।আগেই বুকিং দেওয়া এই হোটেলে সে উঠেছে।দীঘ’১৮বছর পর মেহমুদ বাংলাদেশ এ এসেছে।অনেকটা অভিমান করে সে এদেশ ছেড়েছিল।
কি আছে এ দেশে।ভাবতেই তার বিরক্ত লাগছে।পুরোনো স্মৃতি গুলো তার মনে উঠে আসে। মনে হয় সেদিনকার কথা।
তাদের বাড়ি নেএকোনা শহরের পলাশ পুর গ্রামে।মেহমুদ এর মা মারা যাবার পর তার বাবা সোবহান সাহেব মেহমুদ কে এই নেএকোনা বাড়িতে নিয়ে আসে। মেহমুদ সোবহান সাহেবের ২য় ঘরের সন্তান।মেহমুদ এর মা রাহেলাকে এই বাড়ির কেউ মেনে নেয় নি।মা মারা যাবার পর মেহমুদ এর দেখাশুনা করার কেউ ছিলনা।সোবহান সাহেব মেহমুদ কে এই বাড়িতে নিয়ে আসেন।তখন মেহমুদ এর বয়স মাএ দশ বছর।

মেহমুদ এই বাড়িতে এসে দেখে এখানে সোবহান সাহেবের স্ত্রী ও এক সন্তান আছে।ছেলেটি তার থেকে দুই এক বছরের বড়।নাম মাহিম।এই বাড়িতে আসার পর কেউ মেহমুদ কে মেনে নেয় না।বিশেষ করে মাহিম এর মা।সবাই তার সাথে খারাপ ব্যবহার করতে থাকে কিন্তু মাহিম তার সৎ ভাই যেন মেহমুদের আরেকরা মা হয়ে যায়।মাহিম তার খেয়াল রাখতে লাগলো।এই বাড়ির কারো সাথে যদি সে কথা বলতো তা একমাএ মাহিম।অবশ্য সোবহান সাহেব মেহমুদ কে অনেক ভালোবাসতেন তবে মাহিম ই তার সুখেদুখে তার পাশে ছিলো।তার মায়ের অভাব পূরন করতো। যেন একই মায়ের পেটের ভাই।

এস এস সি পরিক্ষা দেওয়ার পর সোবহান সাহেব সহপরিবার সহ ঢাকায় চলে আসেন।এখানে ব্যবসা শুরু করেন।তার গাড়ীর ব্যবসা। কয়েক বছরের মধ্যে সোবহান সাহেব লাভবান হতে শুরু করেন আর সেই সাথে বেড়ে যায় মেহমুদের উপর অত্যাচার।মেহমুদের যাওয়া কোন পথ ছিল না।মাহিম তাকে সবসময় সাহস যোগাতো।হঠাৎ একদিন গাড়ি এক্সিডেন্ট এ সোবহান সাহেব মারা যান।এরপর ঢাকার বাড়িতে থাকা মেহমুদের পক্ষে আর সম্ভব হয় না তার।বহু কষ্টে সে আমেরিকান ভিসা যোগাড় করে সেখানে পাড়ি দেয়।পিছনে আর ফিরে তাকায় নি।বাড়ির সাথে কোন যোগাযোগ আর রাখেনি।সে জানে তার কেউ নাই।

আজ সে আমেরিকান নাগরিক।ঐখানে তার খাবারের ব্যবসা। সেটা খুব ভালো চলে।বিয়ে করে নাই।ছয় ফিটের মতো লম্বা সে।গায়ের রং একসময় সাদা ছিলো এখন তামাটে।পেটা শরীর। সে নিয়মিত জিমে যায়।কানের কাছে কয়েকগাছি চুল ছাড়া বয়সের আর কোন ছাপ পরে নাই তার, যেনো চুয়াল্লিশ বছরের পৌড় এক যুবক।আমেরিকায় তার বান্ধবী আছে নাম সিলভিয়া।সিলভিয়া তার ম্যানেজার। ও কাজটা ভালো বুঝে।হয়তো ওকেই বিয়ে করবে।কিন্তু কিসের যেন একটা অভাব রয়েছে ওদের মধ্যে মেহমুদ বুঝতে পারেনা।তাই বিয়েটা করা হচ্ছে না।

মেহমুদ বাংলাদেশ এ এসেছে একটা বিশেষ কাজে।তাদের পারিবারিক উকিল নিজাম সাহেব তাকে অনেক অনুরোধ করে এখানে এনেছেন। সে আসতো না যদি না সে শুনতো মাহিম তার ভাই মারা গেছে।তার ছোট দুইটা বাচ্চা আছে তাদের আইনি একটা ব্যবস্থা করে দিতে হবে। মাহিমের কাছে তার ঋন আছে সেটা শোধ করতে হবে শুধু এই কারনে সে এসেছে।
নিজাম সাহেব বিকাল চারটায় আসবেন তখন কথা হবে কাজ শেষ করে তাকে দুই তিন দিনের ভিতর আবার আমেরিকায় ফিরতে হবে।।।

নিজাম সাহেব বসে আছে হোটেলের সোফায় আর মেহমুদ বসে আছে বিছানায়।ছোটখাট একজন মানুষ।বয়স তার থেকে একটু বেশি হবে মনে হয়।চোখে চশমা। তাদের সামনে কফি কেউই খাচ্ছে না।আধাঘণ্টা ধরে নিজাম সাহেব কথা বলছে।মেহমুদ বিরক্ত হয়ে শুনছে।।।

নিজাম সাহেব আপনি কি বলতে চান।
আমি ঐ বাড়িতে যেয়ে থাকবো আর বাচ্চাদের দেখাশোনা করবো।কি বলেন এইগুলা মেহমুদের কণ্ঠে বিরক্তি প্রকাশ পায়।
–না আমি সে ভাবে বলি নি।আমি বলতে চাইছি বাচ্চা দুটো ছোট এরা নাবালক।
–এরা সাবালক না হওয়া পয’ন্ত এদের দায়িত্ব তুমি নাও।তাহলেই হবে।নিজাম সাহেব বলেন।
-আমার কোন সম্পতি লাগবেনা।
আপনি ওদের সব দিয়ে দেন।কি ঝামেলা মেহমুদ বলে
মেহমুদ তুমি মনে হয় জাননা বাচ্চা দুটোর মা নেই।রুমা মারা যাবার পর মাহিম জারীন কে পরে বিয়ে করে বাচ্চাদের দেখাশোনার জন্য।

আসলে দেখাশোনার বদলে ওদের ওপর অনেক অত্যাচার হয়।তুমি যদি বাচ্চাদের কাস্টাডি না নাও তাহলে জারীন ওদের কাস্টা’ডি নিয়ে নিবে সব সম্পতি ওর হাতে চলে যাবে।কো’ট ও রায় দিবে ওদের দেখাশোনার জন্য জারীন ই এককমাএ ওদের কাছের মানুষ।কেউ না জানুক আমি তো জানি জারীন টাকা পয়সার জন্য কত ভয়ংকর হতে পারে। বাচ্চারা কিছুই পাবে না।আইনত জারীন মাহিমের স্ত্রী তুমি যদি সম্পতি দাবী না কর ও সব পাবে।আইনত ওর যা প্রাপ্য তা সে নিক, তার জন্য আমি তো কিছু বলছি না।ওর ভাগে যা পায় তা নিক।কিন্তু সে তা করবে না,সে কো’ট এ বাচ্চাদের দায়িত্ব নিয়ে নিতে চাইবে সংগে সব সম্পত্তি। তারপর হয়তো ওদের কে মেরে সব কিছু নিজের নামে করে নিবে।
মাহিমের মৃত্যুটাও একটা রহস্য।মাহিম ছাদ থেকে নাকি পা পিছলে পরে যায়।আচ্ছা এমন কি হতে পারে না যে কেউ ওকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে।পুলিশ তদন্ত করছে।একটা প্রমাণ পেলে ওকে আমি জেলে ঢুকাবো।তুমি আমাকে সাহায্য কর।দয়া কর মেহমুদ। নিজাম সাহেব একনাগারে কথা গুলো বলে যায়।

মেহমুদের মন নরম হয় কথা গুলো শুনে।
বেশ আমায় কি করতে হবে মেহমুদ জিগাসা করে
জারীন কো’টে একটা দলিল জমা দিয়েছে, সব কিছুর মালিক মাহিম বলে।এটা কিছু হলো।
বত’মান দলিল এ তোমার নাম উল্লেখ নাই।জারীন এই দলিলটা কো’ট এ জমা দিয়েছে।কোন দাবিদার নেই।অথচ ও কিন্তু তোমার কথা জানে,মাহিম তাকে বলেছে।দেখ সে তোমার নাম দলিলে উল্লেখ করে নাই।
আমার জানামতে তোমার বাবার পুরনো একটা দলিল ছিলো সেখানে তোমাদের দুই ভাইয়ের নামে সব কিছু উইল করে দেওয়া।ঐটা পেলে বাকি কাজগুলো প্রমান করতে সহজ হতো তুমি কি জান ঐটা কোথায়? নিজাম সাহেব বললেন।

আমার ঠিক মনে নাই কোথায়। আমি জানি না মেহমুদ বলে
আহা, একটু মনে করার চেষ্টা কর, নিজাম সাহেব বলে
ঠিক আছে, আমাকে ভাবার সময় দেন মেহমুদ বলে।
নিজাম সাহেব উঠে দাড়ায় কি ভেবে দরজার কাছ থেকে ফিরে আসে বলে
তুমি কি বাচ্চাদের দেখতে যাবে না।যাও একবার দেখে আসো ওরা কিভাবে আছে।ঔইটা তো তোমার ও বাড়ি।মাহিম আমার বন্ধু আমি আমার বন্ধুত্বের দায়িত্ব পালন করছি তুমি তোমার দায়িত্ব পালন কর।।এই বলে নিজাম সাহেব রুম থেকে বের হয়ে যান।
মেহমুদ কিছু বলতে গিয়ে ও কিছু বললো না।তার কিছুই ভালো লাগছেনা।
সে কফির মগটা হাতে নিয়ে তাতে চুমুক দেয় তার কাছে সব কিছু তেতো লাগছে
সে চিন্তা করছে।

মেহমুদ শাহজাহানপুর এলাকায় আঠারো বছর পরে এলো।সামনের গলিটা পার হলেই বড় আমগাছটার পাশে দোতালা বাড়িটা তাদের।সোবহান সাহেব খুব অল্প টাকা দিয়ে এই বাড়িটা কিনেছিলো।মেহমুদের মনেপরে তার বাবা রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ করে প্রায় তাদের সাথে গল্পগুজব করতো।তখন একদিন বাড়িটা কিভাবে কিনেছিলো মাহিম আর তাকে বলেছিলো।মেহমুদ তার বাবার আরো কথা মনেকরার চেষ্টা করছে।এই ঝামেলা থেকে বাঁচতে হলে তাকে মনে করতেই হবে।তার মনে আছে বাবার কিছু বন্ধু ছিলো তারা প্রায় এই বাড়িতে আসতো।তাদের মধ্যে একজন আসতো নেএকোনা থেকে। কি যেনো নাম মনেপরছে না।হঠাৎ তার মনে পরে ওসমান গনি।হ্যাঁ, উনি উকিল ছিলেন প্রায় তিনি ওকালতির কাজে ঢাকায় আসতেন।এবং আমাদের এই বাড়িতে উঠতেন।বাবার সাথে গনি চাচার ভালো খাতির ছিলো।গনি চাচার কাছে কি দলিলটা আছে। গনি চাচা এখন কোথায়।মেহমুদ কিছুই জানে না।
এই সব ভাবতে ভাবতে মেহমুদ বাড়ির ভিতর প্রবেশ করে।মেহমুদ দরজার সামনে এসে দাড়ায়।দরজাটা খোলা ঢুকবে কি ঢুকবে না ভাবতে ভাবতে সে ঢুকে পরে।সামনে বসার ঘর। সোফার মধ্যে দুইটা বাচ্চা ছেলে মেয়ে বসে আছে।ওরা মেহমুদ কে দেখে উঠে দাড়ায়।ছেলেটা বলে উঠে কে আপনি? কাকে চাই।মেহমুদ ভালো করে লক্ষ করে ছেলেটার বয়স নয় দশ হবে।আর মেয়েটার ছয় সাত হবে।মেয়েটা অবিকল মাহিমের মত দেখতে।মেহমুদের মনটা কেমন জানি করে উঠে।।
ইয়ে বাড়িতে বড় কেউ নেই।আমি মেহমুদ, আমেরিকা থেকে এসেছি। মেহমুদ আমতা আমতা করে বলে।
তুমি মেহমুদ চাচ্চু।।।।
বলেই মেয়েটা মেহমুদের কোলে ঝাপিয়ে পরে।মেয়েটা মেহমুদ কে জড়িয়ে ধরে বলে, বাবা বলেছিলো তুমি আসবে। আসতে এতো দেরি করলে কেনো চাচ্চু।ভাইয়া বলেছিলো তুমি আসবেনা।দেখছিস ভাইয়া চাচ্চু এসেছে। আমাদের আর কিছু হবে না এই বলে সে তার ভাইয়ের দিকে তাকায়।ছেলেটি ও হাসিমুখে মেহমুদের দিকে তাকায়।তাদের চোখে কেমন সস্থির ছায়া।
মেহমুদ কখনও এইরকম অবস্থায় পরে নাই।তার ছন্ন ছাড়া জীবন।কি বলবে সে ভেবে পায় না।বলে,কি নাম তোমাদের? আমি জারা ভাইয়া সিয়াম, বলেই জারা ফোকলা দাঁতে ফিক করে হেসে দেয়।সিয়াম ও হেসে দেয়।ওদের হাসি দেখে মেহমুদ ও হাসে।তাই পাকা বুড়ি বলে মেহমুদ জারার গাল টিপে দেয়।
জারা উফ করে উঠে
কি হলো, মেহমুদ জিজ্ঞাসা করে,
সকালবেলা পানির গ্লাসটা হাত থেকে পরে ভেঙে গিয়েছিল তার জন্য জারীন মামুনি খুব জোড়ে চড় মেরেছে।দেখো চাচ্চু এখনও ব্যাথা করছে বলেই জারা তার গালে হাত বুলায়।
মেহমুদ দেখে ডানগালটা ফুলে লাল হয়ে আছে সেখানে পাঁচ আঙুল ছাপ।
মেহমুদের হঠাৎ খুব রাগ লাগে।।।এভাবে কেউ বাচ্চা দের গায়ে হাত তোলে।।।
পিছন থেকে কে যেনো বলে উঠে কে আপনি ?কি চাই?
মেহমুদ ঘুরে তাকায় দেখে দরজার সামনে অসম্ভব সুন্দর একটা মেয়ে দাড়িয়ে আছে।
এবার মেহমুদ বলে আপনি কে??

চলবে।।।।

About Bithi Sultana

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *