Tuesday , July 23 2019
Breaking News
Home / ইতিহাস / মাউন্টেন ম্যান,দশরথ বাবা

মাউন্টেন ম্যান,দশরথ বাবা

মাউন্টেন ম্যান, দশরথ বাবা

যুগ যুগ ধরে কারো স্মৃতি রয়ে যায় কারো মনের গহীনে ।কতটা ভালোবাসি, এতটা যে কোন পাহাড়ের ক্ষমতা নেই আটকাবে, এতটা যে কোন আকাশে না এ বিস্তৃত হবে, এতটা যে না কারো চিন্তায় এর জায়গা হবে!’

কারো জন্য কাউকে হারিয়ে ফেললে তার প্রতি মানুষের প্রতিহিংসা, ক্রোধ কাজ করে একটা প্রতিশোধের, তিব্র ইচ্ছে তৈরি হয় কারো মনের কোনে। কিন্তু সেটা যদি কোন দূর্ঘটনা হয় তাহলে কিভাবে ঘৃণা করবেন। আর সেটা যদি হয় কোন পাহাড় তাহলে কি করবেন? পাহাড়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও ক্ষোভ এই নিয়েই দশরথের গল্প।

গল্পটা শুরু ১৯৬০ সালে। বিহারের সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন গ্রাম গেহলৌরের বাসিন্দা দশরথ।যে গ্রামের মানুষদের জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে প্রতিদিন চার মাইলের পথ পাড়ি দিতে ৪০ মাইল পথ ঘুরতে হতো, কিংবা পায়ে হেঁটে ৩০০ ফুট উঁচু পাহাড় পেরোতে হতো। এখানেই থাকেন গরিব কৃষক দশরথ মাঝি।সেই গ্রামে, প্রাচীরের মত মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল বিশাল এক পাহাড়, বাইরের দুনিয়া থেকে যা বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল সেই গ্রামকে, দৈনন্দিন কাজে এই পাহাড়কে টপকাতে হয় তাদের।পাহাড়কে পাশ কাটিয়ে পার্শ্ববর্তী শহরে যেতে গ্রামবাসীকে পাড়ি দিতে হয় প্রায় ৫৫ কিলোমিটার পথ।

অধিকাংশ গ্রামবাসীর মতোই দশরথ কাজ করেন পাহাড়ে। দুপুরের দিকে খাবার নিয়ে হাজির হতো ফাল্গুনি। একদিন ফাল্গুনির জন্য অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলেন দশরথ। সে সময় সেখানে গ্রামবাসীদের একজন খবর দেয় তার জন্য খাবার নিয়ে আসার সময় পাহাড়ে পা পিছলে ভীষণ রকম আহত হয়েছেন ফাল্গুনি। যত দ্রুত সম্ভব নিতে হবে ডাক্তারের কাছে। কিন্তু হাসপাতাল যে সত্তর কিলোমিটার দূর।হাসপাতাল নেয়ার সময় পথেই মারা যান তিনি। স্ত্রীকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন, তাই কোনোমতেই তার অস্বাভাবিক মৃত্যুটাকে মেনে নিতে পারছিলেন না। বার বার মনে হচ্ছিল এই পাহাড়টা না থাকলেই সব অন্যরকম হতে পারত। যদি পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে একটা রাস্তা থাকত! সেই ভাবনা থেকে আশপাশের অনেকের সঙ্গে আলোচনা করলেন দশরথ মাঝি। কিন্তু সবার এক কথা কিচ্ছু করার নেই। দশরথ মাঝি সেটা মানতে রাজি নন। তার মনে যে আজব এক সংকল্প ঘুরছিল ! তিনি প্রস্তাব দিলেন সবাই মিলে কাটতে হবে পাহাড়। বানাতে হবে পথ। অন্যরা তার কথা শুনে হেসেই উড়িয়ে দিল। সবার একই কথা এত বড় পাথুরে পাহাড় কাটা একেবারেই অসম্ভব। দশরথের সেই প্রস্তাবে কেউ রাজি হলো না। কিন্তু দশরথ থামার পাত্র নন। ঠিক করলেন, পাহাড়টাকেই ভেঙে ফেলবেন নিজের হাতে। পাহাড়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা, ক্ষোভে বিষিয়ে উঠে তার অন্তর। রাত-দিন এক করে চলতে থাকে তার সংগ্রাম।

দশরথ পাহাড় কাটা শুরু করেছিলেন ১৯৬০ সালের দিকে। তখন দশরথের বয়স ছিল ৩৫। এর প্রায় বাইশ বছর পর ১৯৮২ সালে একদিন তিনি তার পথ থেকে সরান শেষ পাথরটি । পাহাড়ের বুক চিরে তখন তৈরি হয় ৩৬০ ফুট লম্বা ও ৩০ ফুট চওড়া একটি পথ।তার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে ৭০ কিলোমিটারের দূরত্ব নেমে আসে মাত্র পনের কিলোমিটারে। আর এখন ৭০ কিলোমিটার পাহাড় ট্রেকিংয়ের বদলে মাত্র ৫ কিলোমিটার পাকা রাস্তা পেরোলেই হাতের মুঠোয় চলে আসে সভ্যতার আলো। গেহলৌরসহ আশপাশের ৬০টি গ্রামের মানুষের কাছে দশরথ হয়ে গেলেন ‘বাবা’, ‘মাউন্টেন ম্যান’। শুরুর দিকে দশরথ মাঝিকে সবাই পাগল বললেও শেষ দিকে তিনি অনেকের সহযোগিতা পেয়েছেন।

তবে এখানেই শেষ হয়নি দশরথ মাঝির সংগ্রাম।
এ রাস্তাকে মেইন রোডের সাথে সংযুক্ত করার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করতে দিল্লী যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু দিল্লী যাওয়ার মতো আর্থিক সংগতি তার নেই।
তিনি পায়ে হেঁটেই রওয়ানা দেন বিহার থেকে দিল্লী। পথে যেতে যেতে সকল ষ্টেশন মাস্টার এর কাছ থেকে স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন তিনি। কিন্তু দিল্লীতে গিয়ে দেখা করতে পারেননি প্রধানমন্ত্রীর সাথে।ফিরে এসে দেখা করেন মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের সঙ্গে। মাঝির কর্মকাণ্ডের কথা শুনে বিস্মিত হয়ে যান বিহারের মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্য সরকারের তরফে তাঁর নাম পদ্মশ্রীর জন্য পাঠানো হয়। কিন্তু তাতে বাগড়া দেয় বনমন্ত্রক। বন সৃজন নষ্ট হয়েছে বলে মাঝির কাজকে বেআইনি তকমা দেয় তারা। ততদিনে অবশ্য রাজ্যবাসী তাঁকে প্রিয় খেতাবটা দিয়ে ফেলেছে। দশরথ মাঝি তখন তাঁদের কাছে কেবলই ‘বাবা’।

ফাল্গুনির প্রতি ভালবাসার জন্য গেহলরের সহায় সম্বলহীন দশরথ মাঝি বাইশ বছর ধরে একাই কেটে গেছেন পাথুরে পাহাড়। পরবর্তীতে যার নাম হয় ‘দশরথ মাঝি রোড’।২০০৭ সালের ১৭ আগস্ট প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন দশরথ। বিহার রাজ্য সরকার সরকারিভাবে তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠান আয়োজন করে।তাঁর নামে ২০১১ সালে সরকারিভাবে রাস্তাটির নামকরন করা হয় ” দশরথ মাঝি সড়ক”
তাঁর জীবন কাহিনী নিয়ে ২০১৫ সালে ভারতে তৈরি হয় ” Manjhi The Mountain Man ” নামের একটি সিনেমা। এবং আরো বেশ কিছু তথ্যচিএ তৈরি করা হয়।

পাহাড় মানব দশরথ মাঝির তৈরি করা এই পথ কি কেবলই পথ। আসলে তা কেবল পথ নয়, তা অনবদ্য এক প্রেমের নিদর্শনও বটে! প্রেমে-শ্রমে তার গোটা জীবনই অনন্য যাত্রাপথের। অনুপ্রেরণা পাহাড় জয়ের দিন মাঝির স্বপ্ন চোখে ধরা দিলো অদ্ভুত এক মুক্তির আনন্দ। এ মুক্তি অব্যবহিত অন্তর্জালকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে, জানান দিল জগতে প্রেম আছে।জীবনে লক্ষ্য বানিয়ে দশরথ মাঝি মানবতার যে উচ্চতা ছুঁলেন তার কাছে যেন পাহাড়ের উচ্চতাও হার মেনেছে।

সূএ _উইকিপিডিয়া , টাইমস অফ ইন্ডিয়া , হিন্দুস্তান টাইমস, দ্যা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, প্রথম আলো।

About Bithi Sultana

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *