Tuesday , July 23 2019
Breaking News
Home / ক্যারিয়ার / বিশ্ব দিবস / পহেলা বৈশাখ
পহেলা বৈশাখ 2019

পহেলা বৈশাখ

ছোটবেলায় নববর্ষের ছুটিতে গ্রামে ছুটে যেতাম মেলা দেখবো বলে। নববর্ষের সময় আমাদের গ্রামে মেলার আয়োজন করা হতো। মেলা মানে হরেক রকমের জিনিসপএ দেখা আমার কাছে। যখনই গ্রামের বাড়ি যেতাম তখন খোঁজ খবর থাকতো মেলা বসবে কিনা। ছোটফুপি ছিলো আমাদের প্রাণ।সে ই সকল খবরাখবর রাখতো। বাড়িতে গিয়ে একদন্ড বসতাম না। ফুপু মেলায় চলো বলে বলে অস্থির করে ফেলতাম। মেলায় যাবো কিযে অদ্ভুত একটা ভালোলাগা কাজ করতো বলে বোঝাতে পারবো না। হেঁটে হেঁটে মেলায় যাওয়া সেখানে বাতাসা, জিলাপি, চিড়ামুড়ি, নাড়ু, কদম, মিষ্টি, দই, কাঠির আসইসক্রিম, হাওয়াই মিঠাই, পিয়াজু খাওয়া। বিভিন্ন খেলনা সামগ্রীর দোকান, মৃৎশিল্পের দোকান কৃষিজ পণ্য, পাটজাত পণ্য, কারু পণ্য, মিষ্টির দোকান,হরেক রকম পশরা সাজিয়ে বসে আছে দোকানীরা। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসতো এসব দোকানীরা। বৈচিত্র্যময় আয়োজন ও বৈচিত্র্যের ভাণ্ডার এই মেলা।

পুতুল নাচ , মোরগ লড়াই, নৌকাবাইচ, ষাঁড়ের লড়াই, লাঠি খেলা, বায়োস্কোপ, নাগরদোলায় চড়ে ঘুরে ঘুরে মেলা দেখা কি যে অদ্ভুত ব্যাপার স্যাপার আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। হাতে রংবেরঙের চুড়ি। সবচেয়ে ভালো লাগতো সাপের খেলা। এখনও ভয়ে শিরশিরে অনুভূতি জাগে। তারপর যেতাম পুতুল নাচ দেখতে। এটা সবচেয়ে আকর্ষণের একটি জায়গা। আগে ভাবতাম পুতুলগুলো বুঝি নিজেরাই কথা বলছে। কি যে অসাধারণ রহস্যের হাতছানি পাতালপুরীর রাজকন্যা আর রাজপুত্র। কিছুক্ষণ আমরা কল্পনার জগতে চলে যেতাম। এরপর যেতাম নৌকা বাইচ দেখতে, ঢাকঢোল পিটিয়ে এক গ্রামের সাথে আরেক গ্রামের মধ্যে হতো প্রতিযোগিতা।বড় ছোট সবাই অংশগ্রহণ করতো নৌকাবাইচে। কিযে আনন্দ,হই হই রই রই সবার মধ্যেই যেনো বয়ে যায়। মোরগ লড়াই, কিভাবে যেনো মোরগ গুলো বুঝতো লড়াই করতে হবে। আমরা অবাক হয়ে দেখতাম। তারপর যেতাম নানান পশরার দোকানে।এটা সেটা কিনে পকেট ভর্তি করে ফেলতাম। বেশি কিনতাম খেলনা। মেলায় আনন্দের বাতাস বইছে সবার মনে। রাতে হতো যাএা পালা সেখানে দূর দূরান্ত থেকে আসতো মানুষজন।

কাগজের চড়কা, বাঁশি বাজিয়ে আর নারিকেল গাছের পাতা দিয়ে ঘড়ি আর চশমা কিনে সন্ধার আগেই বাড়িতে ফেরা। ফিরে পুকুরে ঝাপ দিয়ে সাঁতার কাটা।গরম ভাতের সাথে ঘি আর ইলিশ ভাজা দিয়ে ভাত খাওয়া সে যেনো অমৃত। কি যে দিনগুলো ছিলো। এখন আর সেসব দেখা যায় না। আজ সবাই লোকজ সংস্কৃতি ভুলতে বসেছে।
নববর্ষের উৎসব বাংলার গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণত নববর্ষে তারা বাড়িঘর পরিষ্কার রাখে, ব্যবহার্য সামগ্রী ধোয়ামোছা করে এবং সকালে স্নানাদি সেরে পূত-পবিত্র হয়। এ দিনটিতে ভালো খাওয়া, ভালো থাকা এবং ভালো পরতে পারাকে তারা ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলজনক বলে মনে করে। নববর্ষে ঘরে ঘরে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং প্রতিবেশীদের আগমন ঘটে। মিষ্টি-পিঠা-পায়েসসহ নানা রকম লোকজ সংস্কৃতির আয়োজন হয়।সকলের মুখে ফুটে উঠেছে খুশির আনন্দ।

অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। এটি পুরোপুরিই একটি অর্থনৈতিক ব্যাপার। গ্রামে-গঞ্জে-নগরে ব্যবসায়ীরা নববর্ষের প্রারম্ভে তাঁদের পুরানো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে হিসাবের নতুন খাতা খুলতেন। এ উপলক্ষে তাঁরা নতুন-পুরাতন খদ্দেরদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টি বিতরণ করতেন এবং নতুনভাবে তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগসূত্র স্থাপন করতেন। চিরাচরিত এ অনুষ্ঠানটি আজও পালিত হয়।
ধারনা করা হয় মুগল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০/১১ মার্চ বাংলা সন প্রবর্তন করেন এবং তা কার্যকর হয় তাঁর সিংহাসন-আরোহণের সময় থেকে (৫ নভেম্বর ১৫৫৬)। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসনকে ভিত্তি করে বাংলা সন প্রবর্তিত হয়। নতুন সনটি প্রথমে ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত ছিল,পরে তা বঙ্গাব্দ নাম পরিচিতি পায়।
আসলে নববর্ষকে উৎসবমুখর করে তোলে বৈশাখী মেলা। এটি মূলত সর্বজনীন লোকজ মেলা। এ মেলা অত্যন্ত আনন্দঘন হয়ে থাকে। স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য, কারুপণ্য, লোকশিল্পজাত পণ্য, কুটির শিল্পজাত সামগ্রী, সব প্রকার হস্তশিল্পজাত ও মৃৎশিল্পজাত সামগ্রী এই মেলায় পাওয়া যায়। এছাড়া শিশু-কিশোরদের খেলনা, মহিলাদের সাজ-সজ্জার সামগ্রী এবং বিভিন্ন লোকজ খাদ্যদ্রব্য যেমন: চিড়া, মুড়ি, খৈ, বাতাসা, বিভিন্ন প্রকার মিষ্টি প্রভৃতির বৈচিত্র্যময় সমারোহ থাকে মেলায়। মেলায় বিনোদনেরও ব্যবস্থা থাকে।এছাড়া নাটক, পুতুল নাচ, নাগরদোলা, সার্কাস ইত্যাদি মেলার বিশেষ আকর্ষণ। এছাড়া শিশু-কিশোরদের আকর্ষণের জন্য থাকে বায়োস্কোপ। শহরাঞ্চলে নগর সংস্কৃতির আমেজেও এখন বৈশাখী মেলা বসে এবং এই মেলা বাঙালিদের কাছে এক অনাবিল মিলন মেলায় পরিণত হয়। বৈশাখী মেলা বাঙালির আনন্দঘন লোকায়ত সংস্কৃতির ধারক।
বাংলাদেশের যেসব স্থানে বৈশাখী মেলা বসে সেসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, সাভার, রংপুরের পায়রাবন্দ, দিনাজপুরের ফুলছড়ি ঘাট এলাকা, মহাস্থানগড়, কুমিল্লার লাঙ্গলকোট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মহেশপুর, খুলনার সাতগাছি, ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল অঞ্চল, সিলেটের জাফলং, মণিপুর, বরিশালের ব্যাসকাঠি-বাটনাতলা, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, টুঙ্গিপাড়া ও মুজিবনগর এলাকা।
ঢাকার নিকটবর্তী শুভাঢ্যার বৈশাখী মেলা, টঙ্গীর স্নানকাটা মেলা, মিরপুর দিগাঁও মেলা, সোলারটেক মেলা, শ্যামসিদ্ধি মেলা, ভাগ্যকুল মেলা, কুকুটিয়া মেলা এবং রাজনগর মেলা উল্লেখযোগ্য। দিনাজপুরের ফুলতলী, রাণীশংকৈল, রাজশাহীর শিবতলীর বৈশাখী মেলাও বর্তমানে বিরাট উৎসবের রূপ নিয়েছে।
বর্তমানে নগরজীবনে নগর-সংস্কৃতির আদলে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে নববর্ষ উৎযাপিত হয়। পহেলা বৈশাখের প্রভাতে উদীয়মান সূর্যকে স্বাগত জানানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় নববর্ষের উৎসব। এ সময় নতুন সূর্যকে প্রত্যক্ষ করতে উদ্যানের কোনো বৃহৎ বৃক্ষমূলে বা লেকের ধারে অতি প্রত্যূষে নগরবাসীরা সমবেত হয়। নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে শিল্পীরা সংগীত পরিবেশন করেন। এদিন সাধারণত সব শ্রেণীর এবং সব বয়সের মানুষ ঐতিহ্যবাহী বাঙালি পোশাক পরিধান করে। নববর্ষকে স্বাগত জানাতে তরুণীরা লালপেড়ে সাদা শাড়ি, হাতে চুড়ি, খোপায় ফুল, গলায় ফুলের মালা এবং কপালে টিপ পরে; আর ছেলেরা পরে পাজামা ও পাঞ্জাবি। কেউ কেউ ধুতি-পাঞ্জাবিও পরে। এদিন সকালবেলা পানতা ভাত খাওয়া একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। সঙ্গে থাকে ইলিশ মাছ ভাজা। এভাবে লোকজ বর্ষবরণ প্রথাগুলির কোনো কোনোটির অনুসরণের মাধ্যমে গ্রামীণ ঐতিহ্য অনেকটা সংরক্ষিত হচ্ছে।

“বাংলা নববর্ষ ও চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে তিন পার্বত্য জেলা- রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে পাহাড়িদের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব ‘বৈসাবি’ আনন্দমুখর পরিবেশে পালিত হয়। এটি হল পাহাড়িদের সবচেয়ে বড় উৎসব। “নববর্ষের দিন মারমা জনগোষ্ঠী আয়োজন করে ঐতিহ্যবাহী পানি খেলা। পানিকে পবিত্রতার প্রতীক ধরে নিয়ে মারমারা তরুণ-তরুণীদের পানি ছিটিয়ে পবিত্র ও শুদ্ধ করে নেয়। পাহাড়িদের মধ্যে পানি উৎসবটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।“পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমারা বিজু বা বিঝু উৎসবকে তিনটি ভাগে পালন করে। প্রথম দিনটির নাম ফুলবিজু। এ দিন শিশু কিশোররা ফুল তুলে ঘর সাজায়। দ্বিতীয় দিনটি হচ্ছে মুলবিজু। এদিনে হয় মূল অনুষ্ঠান। এদিন নানারকম সব্জির সমন্বয়ে এক ধরনের নিরামিষ রান্না করা হয়, যার নাম “পাজন। বিভিন্ন ধরণের ঐতিহ্যবাহী পিঠা ও মিষ্টান্নও তৈরি করা হয়। অতিথিদের জন্য এদিন সবার ঘরের দরজা খোলা থাকে।”

বাংলা বছরের প্রথম দিন সকল আনন্দ ঘিরে থাকে এই নববর্ষের মিলন মেলা কে ঘিরে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অধীনে মঙ্গল শোভাযাত্রার বের হয়।শোভাযাত্রায় সকল অমঙ্গল কে দূর করে বয়ে আনে মঙ্গল বার্তা বহন করে। ঢাকার বৈশাখী উৎসবের একটি আবশ্যিক অঙ্গ এই মঙ্গল শোভাযাত্রা। পহেলা বৈশাখের সকালে এই শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয়। এই শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবন এবং আবহমান বাংলাকে ফুটিয়ে তোলা হয়। শোভাযাত্রায় সকল শ্রেণীর-পেশার বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশগ্রহণ করে।ছোট বড় সকলেই আসতে চেষ্টা করে। রমনা বটমূলে মেলা বসে। শোভাযাত্রার জন্য বানানো হয় বিভিন্ন রঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি। ১৯৮৯ সাল থেকে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখ উৎসবের একটি অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বাঙালির প্রাণের উৎসব এই বাংলা নববর্ষ। সকল অমঙ্গল দূর হয়ে মঙ্গল বয়ে আনে এই উৎসব উৎযাপন। সকলেই নতুন ভোর কে স্বাগত জানিয়ে দিন শুরু করে। বিভিন্ন স্কুল কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বর্ষবরণ উৎযাপন কে ঘিরে থাকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালা।লোকজ ঐতিহ্য বাহী সংস্কৃতিকে পুনরায় উৎযাপিতের মাধ্যমে আয়োজিত হয় বর্ষবরণ উৎসব পালন।

About moktokotha

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *