Tuesday , July 23 2019
Breaking News
Home / শিক্ষা মূলক / গল্প / নিকোটিনের কালো ধোঁয়া
নিকোটিনের কালো ধোঁয়া

নিকোটিনের কালো ধোঁয়া

মাস্টার্স শেষ করে বেকার একটি যুবক আমি সাগর। বাবা মাকে গ্রামে রেখে ঢাকায় এসেছি একটা চাকরীর খোঁজে। ঢাকায় এসে এক ক্লাসমেটের বাসায় আছি গত দুইমাস ধরে। কিন্তু এর কতদিন এভাবে থাকা যায়?? বলেছিলাম কয়েকদিন থাকবো চাকরি হয়ে গেলে চলে যাবো। কিন্তু, ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! আজও একটা চাকরী জোগাড় করতে পারলাম না। চাকরীর পিছনে ছুটতে ছুটতে আজ আমি অনেক ক্লান্ত।

রাতভর ঘুম ভালো হয়নি আজকের ইন্টারভিউর কথা চিন্তা করতে করতে। ভোররাতের সময় ঘুম ঘুম ভাবটা চোখে আসতেই চোখটা একটু বন্ধ করি আর সাথে সাথেই তপুর ডাক।
(যার বাসায় থাকি ওর ডাক না তপু। ওর ভালো নাম শাহরিয়ার নাজিম)
– এই সাগর। ঘুম থেকে উঠবি না? সকাল তো হয়ে গেল। আজকে তোর না একটা ইন্টারভিউ আছে? ওঠ তাড়াতাড়ি।
– মনে মনে চিন্তা করলাম। আর মনে মনে বললাম তোকে কত জ্বালাচ্ছি! তোকে কষ্ট দিয়ে তোর বাসায় থাকতেছি। কত ভালো বন্ধু হলে এমন উপকার করে বল??
তখন আবার ডাকলো,
– সাগর উঠে যা। নাহলে কিন্তু গায়ে পানি ঢেলে দিবো।
– তপু তুই এত ভালো কেন রে? তোর মতে বন্ধু যেন সবার জীবনে আসে। আবারও মনের মধ্যে এমন একটা চিন্তা হলো।
– দাঁড়া পানি ঢালতেছি।
এই বলে যখন তেড়ে আসা শুরু করলো। তখনই আমি উঠে এক দৌড়ে ওয়াশরুমে চলে গেলাম।
আর ও বলে উঠলো
– কিরে এখন যাচ্ছিস কেন? আর একটু ঘুমা।
– তুই আর ঘুমাইতে দিলি কই?
– তোর না আজকে ইন্টারভিউ আছে?
– হ্যাঁ। আছে তো।
– আমি অফিসে চলে যাচ্ছি। টেবিলে নাস্তা দেয়া আছে খেয়ে নিস।
– তুই খেয়ে যা। আমি বাহিরে খেয়ে নিবো (পকেটে টাকা নাই। তবুও বলেছি। কারণ, আর কতদিন ওর নাস্তা খাবো আমি)
– আরে তুই এখন খেয়ে যা। তুই টাকা নষ্ট করবি কেন? আমি বাহিরে খাবো।
– আমি খাবো তোর নাস্তা আর তুই বাহিরে খাবি?
– সমস্যা নাই তোর চাকরী হলে আমাকে দাওয়াত করে বেশি বেশি করে খাওয়াবি। এই বলে একটা জোরে হাঁসি দিলো।
ইচ্ছে করেছিল দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরি। কিন্তু, কোনো এক অজানা কারণে যেতে পারলাম না।
– তাহলে দুজনে ভাগ করে খাই?
– দূর বেশি বুঝিস না। এক জনের নাস্তা দুজনে কি খাবো? তুই খাইস। শোন
– হুম শুনছি। তুই বল।
– শার্ট কোনটা গায় দিবি তুই?
বন্ধুর শার্ট গায় দিয়েই ইন্টারভিউ গুলো দেয়া হচ্ছে। জানিনা কিভাবে এই ঋণ শোধ করবো।
– আমারটা গায় দিয়ে যাবো আজকে।
– তাহলে তোরে তো ঝাড়ুদারের চাকরি দিবে।
– তাতেও আমার হবে রে। তোর বাসায় বসে বসে খেতে হবে না আর।
– একটু কম বুঝ রে ভাই। কালকে ইস্ত্রী করে এনেছিলাম যে শার্টটা আর প্যান্টটা ঐটা তুই গায়ে দিস।
– তুই গায় দিবি কি তাহলে?
– আমি নীল রংয়ের ঐটা গায় দিয়ে যাবো সমস্যা নাই। আমার তো আর ইন্টারভিউ নাই।
– আচ্ছা যা।
আমি ততক্ষনে ব্রাশ করে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে গেছি।
– যাচ্ছি তবে। একটা কথা ছিলো।
– বল। ।
– তোর ছেড়া জুতা পায়ে দিয়ে যাবিনা কিন্তু। আমার শু জোড়া রেখে গেলাম।
চোখে আনন্দের অশ্রু ঝরে পড়লো। ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলাম। আর বললাম।
– থ্যাঙ্কস রে দোস্ত।
– হইছে হইছে। একটা চাকরী খুঁজে তাড়াতাড়ি আমার বাসা থেকে বিদায় হ।
– আমি মুচকি হেসে বললাম ‘কখনোই যাবোনা’।
একটু হেসে দিয়ে ও ওর অফিসে চলে গেল।

তপুর নাস্তা খেয়ে ওর শার্ট প্যান্ট আর ওর জুতা পড়ে ইন্টারভিউর জন্য বাসা থেকে বেরিয়ে পড়লাম।

প্রতিদিনের মতো আজকেও যাচ্ছি একটা ইন্টারভিউ দিতে। এটা আমার সতের নাম্বার ইন্টারভিউ। দিনের পর দিন কাটতে কাটতে আজকে প্রায় দেড় মাস হয়ে গেলো কোনো চাকরীর খোঁজ পেলাম না। চাকরী খুঁজতে খুঁজতে গ্রাম থেকে নিয়ে আসা সাড়ে সাত হাজার টাকা প্রায় শেষের পথে। জানিনা আজকের চাকরীটা হবে কিনা? হলে ভালোই হতো বাবা মায়ের মুখে একটু হাসি ফোটাতে পারতাম আর রিমীর মুখেও হাঁসি ফোটাতে পারতাম।

ভাবছেন এই রিমী কে? রিমী হলো আমার প্ৰণয়ী, আমার ক্লাসমেট এবং আমার লাইফের বেষ্ট ফ্রেন্ড। সেই ইউনিভার্সিটি লাইফে ওর সাথে দেখা হয়। তারপরে হয় বন্ধুত্ব তারপরে এখন প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে আমাদের দুজনের মধ্যে। ওর ফ্যামিলি থেকে ওকে বিয়ের চাপ দিচ্ছে। শুধু আমার একটা চাকরীর অপেক্ষায়ই গত এক বছর যাবৎ এই চাপ সহ্য করে আসছে।

একটা পত্রিকায় চাকরীর খোঁজ করতে গিয়ে দেখি একটা বড় কোম্পানিতে চাকরীর খবর। চাকরিতে যে কোয়ালিটি খুঁজতেছিলো আমি নিজের মধ্যে সেই কোয়ালিটির কিছুটা খুঁজে পেয়েছিলাম। তাইতো যাচ্ছি সেই কোম্পানিতে আজকে চাকরীর ইন্টারভিউটা দিতে।

সকাল এগারোটায় ইন্টারভিউ হওয়ার কথা। কিন্তু আমি আগে আগেই রওয়ানা দিলাম।
ত্রিশটা টাকা খরচের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যই তাড়াতাড়ি রওয়ানা করলাম। কারন, সেই অফিসে যেতে রিক্সা ভাড়া ত্রিশ টাকা।
আমি বুঝি ত্রিশ টাকার মূল্য কত?
এই ত্রিশ টাকায়ই আমার একদিন দুপুরের খাওয়ার খরচ হয়ে যায়। বন্ধুর খাবারগুলোতে তো আর সবসময় ভাগ বসানো যায়না। বন্ধুরও তো একটা জীবন আছে ফ্যামিলি আছে।

সকাল এগারোটায় ইন্টারভিউ আর আমি ঠিক ৬মিনিট আগেই এসে পৌছালাম সেখানে। কিন্তু, ইন্টারভিউ শুরু হতে হতে বাজলো বারোটা। আমার সিরিয়াল পড়ছে ২৬ নাম্বারে। চিন্তা করলাম মোট ২৬ জনের মধ্যে আমার সিরিয়াল ২৬ নাম্বারে তাহলে চাকরির আশা আর কতটুকু আছে? আমার পকেটে নাই লক্ষ লক্ষ টাকা। নাই কোনো মামা – চাচার জোর আমি কি করে এত বড় চাকরিটা পাবো? একটানা ২১জনের ইন্টারভিউ হয়ে গেল। তারপরে অফিসের পিয়ন এসে ঘোষণা দিলো এখন স্যারেরা লাঞ্চে যাবে। লাঞ্চের পর বাকীদের ইন্টারভিউ নিবেন। ততক্ষনে ঘড়ির ছোট্ট কাটাটা দুই এর উপর এসে পড়েছে। ইন্টারভিউ মিস করার ভয়ে আমি কোথাও গেলাম না বাকি চারজন ঠিকই তাদের লাঞ্চটা সারার জন্য বাহিরে গেছে। দুপুর আড়াইটায় আবার ইন্টারভিউ দেয়ার জন্য ডাকা শুরু করেছে। কি আশ্চর্য! বাকি চারজনের কেউই আর লাঞ্চের পর ইন্টারভিউর জন্য ফিরে আসলো না। তাই আমাকেই ডাকা হলো ইন্টারভিউর জন্য। সালাম দিয়ে ইন্টারভিউ বোর্ডে ঢুকলাম। তিনজন পুরুষের সাথে একজন মহিলাও আছেন ইন্টারভিউ বোর্ডে। আমাকে বসতে বলে একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকলো। আল্লাহর অশেষ কৃপায় সবগুলো প্রশ্নের সঠিক জবাব দিলাম। কিন্তু, সবশেষ যা বললো তার জন্য আমি রীতিমতো প্রস্তুত ছিলাম। কারন, আগের কয়েকটা ইন্টারভিউতে এই অভিজ্ঞতাটা হয়েছে। তারা আমার কাছে দুই লক্ষ টাকা দাবী করেছিল। আমি মাথা নীচু করে চুপ করে বসে রইলাম। আমাকে নিয়ে অনেক হাসাহাসি করতে থাকলো সবাই। আমি চুপটি করে সব সহ্য করতে লাগলাম। এক পর্যায়ে তারা আমার গ্রামের ঠিকানা রেখে আমাকে বের হয়ে যেতে বললো।

ইন্টারভিউ বোর্ড থেকে বের হয়ে একটি হোটেলে গিয়ে বললামঃ
– মামা ২০ টাকার ভাত আর ১০ টাকার তরকারি দেন।
– ভাত দেওয়া যাবে। তরকারি এত সস্তা না।
– মামা মাসের শেষ হাতে টাকা নাই। সারাদিন কিছু
খাইনি।
– এই নাও।
– মামা জুল এতো অল্প। আরেকটু দেন।
– ১০ টাকার তরকারীতে যদি ২০ টাকার ঝোল দিয়ে
দেই , কিভাবে হবে?
– না মামা লাগবে না।
কোনোমতে পানি দিয়ে খেয়ে খাবারের বিল দিয়ে
বের হয়ে আসলাম।
হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যা সাতটায় বাসার কাছে চলে আসলাম। কিন্তু, বাসায় না ঢুকে রাতের শহরটাতে ঘুরতে লাগলাম। রাত নয়টায় বাসায় ঢুকলাম।
তপুর অফিস শেষ হয় ছয়টায়। বাসায় আসতে আসতে সাতটা বেজে যায়।
বাসায় ঢুকার সাথে সাথে তপুর প্রশ্নঃ
– কিরে এতক্ষন কোথায় ছিলি?
– এই তো বাহিরে ঘুরছিলাম। কেন রে?
– না এমনিতেই। আন্টি (আমার মা) তোর সাথে কথা বলতে চেয়েছিলো। তোর বাবা নাকি অসুস্থ। তোকে বাড়িতে যেতে বলেছে।
– কি বলিস এসব! আমি কালকেই বাড়িতে যাবো।
– তোর চাকরী??
– চাকরীর পিছনে আর কতকাল ঘুরবো?
– যাওয়ার খরচ আছে??
– আছে।
– লাগলে বলিস।
– লাগবে না। আছে তো।
প্রতিরাতের মতো আজকেও ঘুমাতে ঘুমাতে চারটা বেজে গেছে। খুব সকালে ঘুম থেকে উঠেই দুই বন্ধু একসাথে রওয়ানা দিয়েছি। তপু আমাকে বাসে উঠিয়ে দিয়ে অফিসে যাবে।
– কিরে তোর মন খারাপ? বলে উঠলো তপু।
– কই না তো। তোকে অনেক কষ্ট দিলাম দুইমাস।
– বেশি কথা বলিস না।
– বাড়িতে যাবি কবে তুই??
– আর পনের দিন পরেই অফিস থেকে ছুটি আছে সাতদিনের তখন আমি বাড়িতে যাবো।
– আমাদের বাড়িতে আসবি?
– আমিতো বাড়িতে গেলে শুধু তোদের বাড়িতেই যাই।
কথা শেষ হতে না হতেই আমাদের গন্তব্যে এসে গেছি। নিজের টাকা দিয়ে আমাকে বাসের টিকেট কিনে দিয়ে সীটে বসিয়ে দিয়ে গেলো। আমি টাকা দিতে চাইলাম কিন্তু ও নিলোনা।

বাড়ীতে যাওয়ার সাথে সাথে বাবার চিকিৎসার জন্য বাবার বন্ধু রহিম চাচা কিছু টাকা ধার দিয়েছেন। তা দিয়েই বাবার চিকিৎসা করিয়েছি। পনেরদিন পরে বাবা কিছুটা সুস্থ হয়েছেন।
তপু বাড়িতে এসে আমাদের বাড়ী সবসময়ের মতো এবারও আমাদের বাড়িতে এসেছে। আর ওকে নিয়েই আমি রিমীদের বাড়িতে গেলাম। আর গিয়ে যা শুনলাম তাতে তো আমার মাথার উপরের আকাশটা যেন ভেঙে পড়লো। গত মাসে নাকি ওর বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে ঢাকাতে একটা বড় কম্পানিতে চাকরি করে।
তপু যেদিন ঢাকা চলে যাবে সেদিন ঢাকা থেকে দুজন অপরিচিত লোক আসলো। তপুর কাছ থেকে আমাদের বাসার ঠিকানা নিয়ে আমাদের বাসায় আসলো। তপুও তাদের সাথে আসলো। তারা আমার বাবার কাছে এসে তার হাতে একটা চিঠি ধরিয়ে দিয়ে বললো এটা আপনার ছেলের আপ্যার্টম্যান্ট লেটার। বাবার চোখের পানি দেখে আমিও কেঁদে ফেললাম। চাকরীর চিঠিটা নিয়ে আমিতো অবাক যে কম্পানি থেকে আমাকে সবচেয়ে বেশি অপমান করা হয়েছিলো। যে অফিস থেকে বেশি টাকা দাবী করেছিলো এটাতো সেই কোম্পানির চিঠি মাসিক বেতন ৪০হাজার টাকা সাথে ফ্রী কোয়ার্টার যেখানে ফ্যামিলী নিয়ে থাকা যাবে।
চিঠিটা পেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে চোখের পানিতে ভেসে গেলো সব দুঃখ। সুখের কান্নার অশ্রু জরতেছে চোখ থেকে। তপুকে একদিন বেশি থাকার অনুরোধ করলাম। পরেরদিন বাবা মাকে নিয়ে আমি আর তপু একসাথে রওয়ানা করলাম। তপুকে অনুরোধ করলাম আমাদের সাথে থাকার জন্য। কিন্তু, উপকারের প্রতিদান ভেবে আমাদের সাথে থাকেনি ও।
প্রথম দিন অফিস থেকে ফিরে বাসার ছাদে গিয়ে জীবনের প্রথম একটা সিগারেট জ্বালালাম। হালকা হালকা করে কয়েকটা টান দিন রিমীর কথা ভুলে থাকার বৃথা চেষ্টা করলাম। বুকের কষ্টটা শুধু বাড়তেই থাকে। রিমীকে নিয়ে কল্পনায় বাড়িয়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ করে কল্পনাটা ভেঙে গেল। অতঃপর কল্পনার জগৎ থেকে বের হয়ে নিকোটিনের
কালো ধোঁয়া উড়িয়ে ধূলিমাখা ছাদে আনমনে
হাঁটাহাঁটি শুরু করলাম।
আসলে আমাদের মতো মধ্যবিত্তের আছে অনেক রঙ্গিন
স্বপ্ন। কিন্তু রঙ্গিন স্বপ্নের মাঝে কোনো বাস্তবতা
নাই। কষ্টগুলো ভুলতে নিকোটিনের ধোঁয়া একমাত্র
ভরসা।
“নিকোটিনের কালো ধোঁয়াকে কষ্টও ভয় পায়”!

About moktokotha

Check Also

লাল গোলাপ

লাল গোলাপ

লাল গোলাপ বহুকাল আগে গ্রামে এক কৃষক বাস করতো। তার ছিল একটি মাত্র কন্যা। তার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *